একাকী’ ববিতা, মন কাঁদে ছে’লে-স্বজনদের জন্য

বড় বেশি একা হয়ে পড়েছেন তিনি। ইটপাথরের এই জনকোলাহল শহরেই তার নির্জনবাস। এই একাকিত্ব খানিকটা ক’ষ্টেরও কারণ। আপনজনেরা কেউ কাছে নেই। কেউ দেশে থেকেও নিভৃতবাসে। কেউ আবার বিদেশে।

কখনো মুঠোফোনে ভিডিও কলে দেখা হয়। করো’নাকালে যাপিত জীবনে এটুকুই প্রশান্তি এখন কিংবদন্তি অ’ভিনেত্রী ববিতার। যার অ’ভিনয় দেখে ভা’রতীয় চলচ্চিত্রের প্রবাদপুরুষ সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন, ‘আমি তার মতো এত ভালো অ’ভিনেত্রী এর আগে দেখিনি।’সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘অশনিসংকেত’ ছবিতে নায়িকা ছিলেন ববিতা, যা তাকে এনে দিয়েছিল অসামান্য সব স্বীকৃতি, সম্মান। অস্কারসহ বিশ্ব চলচ্চিত্রের বড় বড় আসরে গিয়েছে ববিতা অ’ভিনীত ছবিটি। সেই সুবাদে গুণী অ’ভিনেত্রী হিসেবে বিশ্বময় নাম ছড়িয়ে পড়েছিল তার।

গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের ঢাকাই চলচ্চিত্রের সাড়াজাগানো অ’ভিনেত্রী ববিতা এখন থাকেন ঢাকার গুলশানে নিজ বাসায়। বৃহস্পতিবার ঢাকা টাইমসের সঙ্গে কথা হয় তার। কেমন আছেন? জবাবে বললেন, ‘সবাই যেমন আছে, আপনারা যেমন আছেন, আমিও সে রকম আছি। তবে আমা’র ক’ষ্টটা একটু বেশি লাগছে। আমি একদম একা মানুষ তো। আমাকে একা থাকতে হয়। একটা-দুইটা কাজের লোক নিয়ে আমি থাকি, দীর্ঘদিন ধরে আছি। গত দেড় বছর যাবৎ।’

বিখ্যাত পরিচালক জহির রায়হানের ‘সংসার’ ছবিতে অ’ভিনয় দিয়ে সিনেমায় যাত্রা হয়েছিল এই নন্দিত শিল্পীর। তিনি তখন কি’শোরী। দেশ স্বাধীনের আগে ‘শেষ পর্যন্ত’ সিনেমায় প্রথম নায়িকা চরিত্রে দেখা যায় তাকে। প্রথম সিনেমায় তার নাম ছিল সুবর্ণা। ববিতা নামটিতে প্রথম পরিচিত হন ‘জালতে সুরুজ কি নিচে’ সিনেমায়। ‘লাইলি মজনু’, ‘নয়নমণি’, ‘ফকির মজনু শাহ’, ‘টাকা আনা পাই’, ‘ওয়াদা’, ‘অবুঝ হৃদয়’, ‘স্বরলিপি’, ‘গো’লাপী এখন ট্রেনে,’ ‘আলোর মিছিল’সহ সাড়ে তিন শ ছবিতে অ’ভিনয় করে নিজেকে তিনি নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়।

ববিতার একমাত্র ছে’লে অনিক। থাকেন কানাডায়। সেখানেই উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন তিনি। ববিতার ভাইয়েরা থাকেন যু’ক্তরাষ্ট্রে। দুই বোন- ষাট থেকে নব্বইয়ের দশকে চলচ্চিত্রের আরও দুই জনপ্রিয় নায়িকা- সুচন্দা আর চ’ম্পা থাকেন ঢাকাতেই। তারাও বাসাতেই থাকেন। বের হন না। তাই বোনদেরও সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ হয় না ববিতার।মন কাঁদে ছে’লের জন্য, স্বজনদের জন্য। দীর্ঘদিন আপনজনদের সংস্প’র্শে না আসতে পারার বেদনা তার কণ্ঠে ফুটে উঠল সহসাই। বললেন, ‘প্রতি বছরই একটা বড় সময় কানাডায় ছে’লের কাছে গিয়ে থাকি।

কিন্তু গত দেড় বছর ধরে যেতে পারছি না। ছে’লেও আসতে পারছে না। আ’মেরিকাতে ভাইয়েরা থাকে, সেখানেও যেতে পারছি না।’ তবে সবার সঙ্গেই ববিতার প্রতিদিন অন্তর্জালের কল্যাণে কথা হয়। ভিডিওতে দেখা হয়। সবাই ভালো আছেন।বড় বোন সুচন্দার ওপেন হার্ট সার্জারি হয় এ বছরের জানুয়ারিতে। ঢাকাতেই। তিনিও বাসায় আছেন। ভালো আছেন। গত মা’র্চে ববিতা ও চ’ম্পা দুজনেই করো’না প্রতিষেধকের প্রথম ডোজ নিয়েছেন। দ্বিতীয় ডোজের সময় এখনো আসেনি।

নায়করাজ রাজ্জাক, ফারুক, জাফর ইকবাল, বুলবুল আহমেদ, আলমগীরসহ গুণী অ’ভিনেতাদের সঙ্গে সিনেমায় জুটি বেঁধেছেন ববিতা। কলকাতার জাঁদরেল অ’ভিনেতা সৌমিত্র চট্টেপাধ্যায়ের বিপরীতে অ’ভিনয় করেছেন ‘অশনিসংকেত’ ছবিতে। তাদের অনেকে আগেই প্রয়াত হয়েছেন। করো’না গত বছরের মাঝনভেম্বরে কেড়ে নেয় অ’ভিনেতা সৌমিত্রকে। কদিন আগে প্রয়াত হলেন ববিতার সমকালীন চলচ্চিত্রের মিষ্টি মে’য়ে খ্যাত কবরী।

নায়ক ফারুক ও আলমগীরও করো’নায় আ’ক্রান্ত। দুজনই চিকিৎসাধীন। প্রিয়জন, কাছের মানুষদের করো’না সংক্রমণের বিষয়েও উদ্বিগ্ন বাঙালির হৃদয় জয় করা এই অ’ভিনেত্রী। বললেন সে কথাও, ‘এখন কোভিডের যে খা’রাপ অবস্থা, কাউকেই তো ছাড়ছে না মনে হয়। এটা নিয়ে খুব দুশ্চিন্তা। যার জন্যে এখন আল্লাহকে ডা’কা ছাড়া আর কিছু নেই। এ-ই আরকি।’মহামা’রির প্রকোপে ঘরব’ন্দি সময়। অখণ্ড অবসর কাটে কী’ভাবে? জবাবে ববিতা বললেন, ‘রোজা রাখা, তাহাজ্জুদ পড়া, তারাবি পড়া, কোরআন শরিফ পড়া এসব নিয়ে আছি।’

নিজের শখের ছাদবাগানটি কেমন আছে? জানালেন এসব নিয়ে কথা বলতে খুব একটা আগ্রহ বোধ করেন না। তবে ছাদ আর বারান্দার নানান গাছগাছালির যত্ন এখন তিনি একাই করছেন। এসব করেও তার সময় কাটে। বললেন, ‘ওটা দেখি নিজে নিজে। কাউকে আসতে দিই না। নিজে নিজে পানি দিই। ওগুলো নিয়েও একটু সময় কাটে।’

ফোনালাপে অনেকটাই নির্লিপ্ত মনে হলো বাংলাদেশের বহু কালজয়ী চলচ্চিত্রের এই অ’ভিনেত্রীকে। চলমান মহামা’রি যে তার জীবনকে ছন্দহীন আর বির’ক্তিকর করে তুলেছে, বুঝতে অ’সুবিধে হলো না। কাজের ব্যস্ততা, প্রিয়জনদের আড্ডা আর শখের বাগান নিয়ে যার প্রা’ণময় সময় কাটত, সেই তিনি আজ নিভৃতবাসে। এই নিঃসঙ্গতা, নিস্তরঙ্গ সময় বড় বেশি বেদনাকাতর করেছে তাকে। নিত্যযাপিত জীবনের আনন্দটুকু আজ তাই নির্বাসিত।

Related Articles

Back to top button
error: Alert: Content is protected !!