সুসময়ে আল্লাহকে স্মরণ করলে আল্লাহ দুঃসময়ে আপনাকে স্মরণ করবেন

ইমাম তিরমিজি (রহ.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইবনে আব্বাস (রা.)-কে উপদেশ দিয়ে বলেন, সুসময়ে তুমি আল্লাহকে স্মরণ করো, আল্লাহতায়ালা দুঃসময়ে তোমাকে স্মরণ করবেন।

এটি রাসুলুল্লাহর (সা.) পক্ষ থেকে শুধু ইবনে আব্বাসের (রা.) প্রতিই নয়; বরং সারাবিশ্বের সব মুসলমানের জন্য একটি অমূল্য উপদেশ। কারণ প্রত্যেকেই চায়, আল্লাহতায়ালা তাকে যাবতীয় বিপদ-আপদ ও দুর্দশা থেকে হেফাজত করুন।আর এ হাদিস অনুযায়ী, দুঃসময়ে আল্লাহতায়ালার সুরক্ষা পাওয়ার উপায় হলো– সুসময়ে বেশি বেশি আল্লাহতায়ালাকে স্মরণ করা।

আনন্দঘন সুসময়ে যে আল্লাহতায়ালাকে ভয় করবে, তার বেঁধে দেয়া সীমা অতিক্রম করবে না, তার আদেশ-নিষেধ মেনে চলবে ও সর্বদা তার প্রশংসাকীর্তন করবে, সে হৃদয়ে আল্লাহতায়ালার জন্য এক গভীর ভালোবাসা অনুভব করবে, যা তাকে তার দুঃসময়ে পথ দেখাবে, হেফাজত করবে। মানুষ যখন সুস্বাস্থ্য উপভোগ করে, সম্পদশালী হয়, পরিবারবর্গ নিয়ে আনন্দে বসবাস করে এবং সব বিষয়ে সার্বিক আনুকূল্য লাভ করে, তখন প্রকৃতপক্ষেই সে সুসময় পার করে।

তবে খেয়াল রাখতে হবে, এই সুসময় যেন তাকে আল্লাহতায়ালার ইবাদত থেকে বিমুখ না করে, কোরআন তিলাওয়াত ও জিকির করা থেকে বিরত না করে, সৎপথ থেকে ফিরিয়ে অসৎ পথে পরিচালিত না করে। সুসময়ে আল্লাহতায়ালাকে ভুলে গিয়ে কেবল দুঃসময়ে তাকে স্মরণ করে তার দ্বারস্থ হওয়া একজন অকৃতজ্ঞ বান্দার বৈশিষ্ট্য। বরং প্রকৃত মুমিন তো সে, যে দুঃসময় আসার আগেই আল্লাহতায়ালার আশ্রয় চায়।

কেননা বিপদে পড়লে কাফের-মুশরিক-মুনাফিকরাও আল্লাহতায়ালাকে স্মরণ করে।আল্লাহতায়ালা বলেন, যখন তারা জাহাজে আরোহন করে, তখন তারা একনিষ্ঠ চিত্তে আল্লাহতায়ালাকে ডাকে; কিন্তু যখনই তিনি তাদের নিরাপদে তীরে পৌঁছে দেন, তখনই তারা শিরকে লিপ্ত হয়। আল-কোরআন ২৯: ৬৫অন্যত্র আল্লাহতায়ালা বলেন, তার পর যখন তাদের আল্লাহ বাঁচিয়ে দিলেন, তখনই তারা অন্যায়ভাবে পৃথিবীতে অনাচার করতে লাগল। আল-কোরআন ১০: ২৩দুঃসময়ে বিপদে পড়লে সবাই আল্লাহতায়ালাকে স্মরণ করে। সুসময়ে আল্লাহতায়ালাকে স্মরণ করা, প্রাপ্ত নেয়ামতের জন্য তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা ও সরল-সঠিক পথে অবিচল থাকাই হলো সত্যিকার ইমানদারের পরিচয়।

যারা সুসময়ে আল্লাহতায়ালাকে ভুলে গিয়ে কেবল দুঃসময়ে আল্লাহকে স্মরণ করে, তাদের পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা ভর্ৎসনা করেছেন। তিনি বলেন, যখন মানুষকে দুঃখ-কষ্ট স্পর্শ করে, তখন সে একাগ্রচিত্তে তার পালনকর্তাকে ডাকে। অতঃপর তিনি যখন তাকে নেয়ামত দান করেন, তখন সে তার কষ্টের কথা ভুলে যায়। যার জন্য সে আল্লাহকে ডেকেছিল এবং আল্লাহর সমকক্ষ স্থির করে ও অপরকে আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করে।

(হে নবী! আপনি) বলুন, তুমি তোমার কুফর সহকারে কিছুকাল জীবন উপভোগ করে নাও। নিশ্চয়ই তুমি জাহান্নামিদের অন্তর্ভুক্ত। আল-কোরআন ৩৯: ৮এ রকম আরও অনেক আয়াত রয়েছে, যেখানে আল্লাহতায়ালা এ ঘৃণ্য বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে আলোচনা করেছেন।মনে রাখতে হবে যে, বিপদে আল্লাহতায়ালা তাদের প্রার্থনাই শোনেন, যারা সুসময়েও আল্লাহতায়ালাকে স্মরণ করত। সুতরাং সেই-ই বুদ্ধিমান, যে সুসময়ে আল্লাহতায়ালার কৃতজ্ঞতা প্রকাশপূর্বক তাকে বেশি বেশি স্মরণ করে দুঃসময়ে তার প্রার্থনার কবুলিয়াতকে নিশ্চিত করে।

এ ব্যাপারে ইউনুসের (আ.) ঘটনাটি উল্লেখযোগ্য। যখন ইউনুস (আ.) সাগরে তিমি মাছের পেটের ভেতর আটকে গিয়েছিলেন, তখন তিনি এই বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আল্লাহতায়ালার কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন।আর আল্লাহতায়ালা তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে তাকে ওই বিপদ থেকে উদ্ধার করেছিলেন। তবে আল্লাহতায়ালা ইউনুস (আ.)-এর আহ্বানে সাড়া দেয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন–

‘সে যদি আমার প্রশংসাকারীদের অন্তর্ভুক্ত না হতো, তা হলে তাকে কেয়ামত পর্যন্ত ওই মাছের পেটে থাকতে হতো।’ আল-কোরআন ৩৭: ১৪৩-১৪৪এখান থেকে বোঝা যায়, যদি ইউনুস (আ.) সুসময়ে বেশি বেশি আল্লাহতায়ালাকে স্মরণ না করতেন, তা হলে আল্লাহতায়ালা তাকে ওই বিপদ থেকে রক্ষা করতেন না।

আর পক্ষান্তরে ফিরআউন যখন আল্লাহতায়ালার নেয়ামতে হাবুডুবু খাচ্ছিল, তখন সে আল্লাহতায়ালাকে অস্বীকার করে বসল। এমনকি একপর্যায়ে সে নিজেকেই প্রভু দাবি করে ফেলল। এর পর যখন আল্লাহ তাকে বিপদগ্রস্ত করলেন, সে যখন সমুদ্রের পানিতে ডুবে যাচ্ছিল, তখন সে আল্লাহতায়ালাকে স্মরণ করে তার সাহায্য কামনা করল।কিন্তু আল্লাহ তাকে সাহায্য করলেন না; বরং সমুদ্রের পানিতে তাকে চুবিয়ে মারলেন। কারণ সে সুসময়ে আল্লাহতায়ালাকে ভুলে গিয়েছিল। এ জন্যই রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি চায় যে, দুঃসময়ে আল্লাহতায়ালা তার ডাকে সাড়া দেবেন, সে যেন সুসময়ে তাকে বেশি বেশি স্মরণ করে। (তিরমিজি)

Related Articles

Back to top button
error: Alert: Content is protected !!